মন খারাপ হলে শরীর কেন ভেঙে পড়ে?

 

 

কখনো কি এমন হয়েছে, কেউ একটা কঠিন কথা বলে গেছে, আর তারপর থেকে বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে? খেতে ইচ্ছে করছে না, ঘুম আসছে না, মাথা ধরে আছে, হাত-পা যেন চলছে না। অথচ শরীরে কোনো অসুখ নেই।

তখন নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন, “আমার তো কিছু হয়নি, তাহলে শরীরটা এমন লাগছে কেন?”

উত্তরটা খুব সহজ। মন আর শরীর আলাদা দুটো ঘর নয়। এরা একই বাড়ির দুটো জানালা। একটা জানালা বন্ধ হলে অন্যটায় অন্ধকার নামে।

১. মন খারাপ হলে শরীর প্রথমে “বিপদ” ভাবে

আমাদের মস্তিষ্ক শারীরিক বিপদ আর মানসিক কষ্টের মধ্যে খুব বেশি তফাত করতে পারে না। কেউ আপনাকে অপমান করলে, সম্পর্ক ভেঙে গেলে, বা দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরলে মস্তিষ্ক শরীরকে সংকেত পাঠায়, “সাবধান, বিপদ আসছে!”

তখন শরীরে কর্টিসল আর অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন ছড়িয়ে পড়ে। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, পেশি শক্ত হয়ে যায়, শ্বাস ছোট হয়ে আসে। শরীর তখন লড়াইয়ের জন্য তৈরি হচ্ছে, অথচ লড়াই করার মতো কেউ সামনে নেই। সেই জমে থাকা চাপটাই ক্লান্তি হয়ে নামে।

২. কাঁধ ভারী, মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা

মন খারাপ থাকলে আমরা অজান্তেই কাঁধ শক্ত করে রাখি, দাঁত চেপে থাকি, ভ্রু কুঁচকে থাকি। দিনের পর দিন এভাবে থাকলে ঘাড়, পিঠ আর মাথায় ব্যথা শুরু হয়। অনেকে বলেন, “বুকের ওপর পাথর চাপা আছে মনে হচ্ছে।” এটা কল্পনা নয়, পেশির টানটান হয়ে থাকারই অনুভূতি।

৩. পেটের সঙ্গে মনের গোপন সম্পর্ক

কষ্টে মানুষ বলে, “পেটটা মোচড় দিচ্ছে।” কথাটা মিথ্যে নয়। আমাদের পাকস্থলী আর মস্তিষ্ক স্নায়ুর মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত। মন খারাপ হলে ক্ষুধা মরে যায়, কারও আবার অতিরিক্ত খাওয়ার ইচ্ছা হয়, কারও গ্যাস বা অস্বস্তি বাড়ে। মনের ঝড় পেটেও ঢেউ তোলে।

৪. ঘুম হারিয়ে গেলে শরীর আরও ভেঙে পড়ে

কষ্টের রাতে চোখ বন্ধ করলেই পুরোনো কথাগুলো ভেসে আসে। ঘুম না হলে পরদিন শরীর ক্লান্ত থাকে, মেজাজ খিটখিটে হয়, সামান্য কিছুতেই কান্না পায়। আবার সেই মন খারাপ থেকেই রাতে ঘুম আসে না। এভাবে একটা চক্র তৈরি হয়, মন শরীরকে ভাঙে, শরীর মনকে।

৫. কান্না চেপে রাখলে শরীর সেটা বহন করে

যে কথা মুখে বলা হয়নি, যে কান্না সবার সামনে কাঁদা হয়নি, সেগুলো হারিয়ে যায় না। শরীরের কোথাও জমা থাকে। আমরা প্রায়ই মুখে হাসি রাখি আর ভেতরে ভেঙে পড়ি। শেষে একদিন শরীর নিজেই বলে দেয়, “আর পারছি না।”

তাহলে কী করবেন?

  • নিজেকে দোষ দেবেন না। মন খারাপ হলে শরীর খারাপ লাগা দুর্বলতা নয়, এটা মানুষ হওয়ার লক্ষণ।
  • গভীর শ্বাস নিন। চার সেকেন্ড শ্বাস নিন, ছয় সেকেন্ড ধরে ছাড়ুন। কয়েকবার করলে শরীর একটু শান্ত হয়।
  • একটু হাঁটুন। খোলা বাতাসে দশ মিনিট হাঁটলেও ভেতরের চাপ কিছুটা নামে।
  • মনের কথা কাউকে বলুন। যে মানুষটির কাছে স্বস্তি পান, তাকে বলুন। বলতে না পারলে ডায়েরিতে লিখুন।
  • ঠিকমতো খান আর ঘুমানোর চেষ্টা করুন। কষ্টের সময়ই শরীরের যত্ন সবচেয়ে বেশি দরকার।
  • প্রার্থনা ও নীরবতায় সময় দিন। যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে মনের কথা বলা অনেক বড় আশ্রয়।

একটা কথা মনে রাখবেন

মন খারাপের সঙ্গে শারীরিক কষ্ট যদি দীর্ঘদিন থাকে, ঘুম-খাওয়া একেবারে নষ্ট হয়ে যায়, বা কিছুই ভালো না লাগে, তাহলে লজ্জা না পেয়ে একজন চিকিৎসক বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলুন। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, এটা নিজেকে ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ।

শেষ কথা

আপনার শরীর আপনার শত্রু নয়। সে আপনাকে ভেঙে ফেলতে চায় না, সে শুধু জানিয়ে দিচ্ছে, “তুমি অনেক বেশি বয়ে বেড়াচ্ছ, এবার একটু থামো।”

তাই আজ নিজের কাছে একটু ক্ষমা চেয়ে নিন। বলুন, “আমি এতদিন অনেক সহ্য করেছি, এবার নিজের যত্ন নেব।”

কারণ যে মনটা এত কিছু সয়েছে, সে একটু আদর পাওয়ার যোগ্য।

 

Leave a Comment