চল্লিশের পরের বয়সটার আলাদা কোনো নাম নেই।
থাকলে ভালো হতো।
কারণ এই বয়সটা না একেবারে তরুণ, না একেবারে বৃদ্ধ। মাঝামাঝি এক অদ্ভুত সময়—যেখানে মানুষ বাইরে থেকে স্থির, কিন্তু ভেতরে অনেক কিছু নড়াচড়া করে।
এই বয়সে বেশিরভাগ মেয়েরই সংসার আছে, সন্তান আছে, দায়িত্ব আছে। সবকিছু ঠিকঠাক চলে। তবু ভেতরে কোথাও একটা ছোট্ট মেয়ে রয়ে যায়—যে এখনো একটু দৌড়াতে চায়, একটু হেসে উঠতে চায়, অকারণে কথা বলতে চায়।
কিন্তু সেই ইচ্ছেগুলোকে খুব বেশি জায়গা দেওয়া যায় না। বাস্তবতা খুব শান্তভাবে এসে বলে—“এখন এসব মানায় না।”
দিন চলে যায়। কাজের ভেতর দিয়ে, দায়িত্বের ভেতর দিয়ে। কিন্তু দিনের শেষে, একটু ফাঁকা সময় এলে মনটা হিসেব করতে বসে—কী পেলাম, কী পেলাম না।
এই হিসেবটা কেউ করতে চায় না, তবু হয়ে যায়।
অনেক সময় মনে হয়, কেউ থাকুক—যার কাছে সব কথা বলা যাবে। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া, কোনো বিচার ছাড়া। শুধু শোনা।
কিন্তু এই বয়সে এসে বন্ধুরাও ব্যস্ত হয়ে যায়। সবাই নিজের জীবনে ডুবে থাকে। ফলে মানুষটা একটু একটু করে নিজের ভেতরেই চুপ হয়ে যায়।
তারপর আসে স্মৃতিরা।
হঠাৎ করে পুরোনো দিনগুলো খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্কুলের ক্লাসরুম, কলেজের আড্ডা, প্রথম কোনো অনুভূতি, কোনো এক বিকেলের বৃষ্টি—সব যেন খুব কাছে চলে আসে। কোনো কারণ ছাড়াই।
কিছু স্মৃতি ভালো লাগে, কিছু কষ্ট দেয়। তবু মানুষ সেগুলোকে দূরে ঠেলে দেয় না। কারণ ওই স্মৃতিগুলোতেই নিজের একটা অংশ লুকিয়ে থাকে।
রাতে আয়নার সামনে দাঁড়ালে মাঝে মাঝে অচেনা লাগে নিজেকে। আগের মতো নেই—এইটা বুঝতে কষ্ট হয়। কিন্তু এই কষ্টটা কেউ দেখে না।
এই বয়সে এসে মেয়েদের মনটা খুব অদ্ভুত হয়ে যায়।
ভালোবাসা চায়—কিন্তু নতুন কিছু না। পুরোনো সেই মানুষটাকেই আবার নতুন করে চায়। আবার একটু আগের মতো করে ডাকা, আগের মতো করে খেয়াল রাখা—এই ছোট ছোট জিনিসগুলোই বড় হয়ে ওঠে।
সবকিছু ঠিকই থাকে, তবু মাঝে মাঝে মনটা অকারণে দূরে চলে যেতে চায়। আবার একটু নিজের মতো করে থাকতে ইচ্ছে করে।
তারপর হঠাৎ করেই সন্তানদের কথা মনে পড়ে। তাদের জন্যই তো সব। তখন আবার নিজেকে গুছিয়ে নেওয়া।
এই বয়সে এসে মানুষ খুব সহজে কাঁদে না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা নীরব কান্না থাকে—যেটা খুব কাছের কেউ না হলে বোঝা যায় না।
সবকিছু সামলাতে সামলাতে একসময় নিজের কথাটাই ভুলে যায়। কী ভালো লাগে, কী চায়—এই প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে মুছে যায়।
শরীরও আগের মতো থাকে না। তবু কাজ থামে না। সংসার থামে না। দায়িত্ব থামে না।
সবকিছু চলতে থাকে।
শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়—
কেউ যদি একটু জিজ্ঞেস করত,
“তুমি কেমন আছো?”
এই বয়সের মেয়েরা খুব বেশি কিছু চায় না।
তারা শুধু চায়—
কেউ একজন তাদের মনের কথাটুকু শুনুক।